বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ওসমান হাদি: আধিপত্যবাদী শক্তির জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন

Author

নকীবুল হক , নোয়াখালী বিজ্ঞান অ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৯৩ বার

“কোনো রাজনীতিবিদের বাসায় মৃত্যু হতে পারে না। এটি কোনো ভালো মৃত্যু নয়। যিনি রাজনীতি করেন, যিনি লড়াই করেন, যিনি বিপ্লবী, যিনি সংগ্রামী—তার মৃত্যু হবে একটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। একটা রাজপথে, একটা গ্লোরির মৃত্যু। আমি তো ভীষণভাবে প্রত্যাশা করি—একটা তুমুল মিছিল হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সেই মিছিলের সামনে আমি আছি, কোনো একটা বুলেট এসে আমার বুকটা হয়তো বিদ্ধ করে দিয়েছে। আর সেই মিছিলে আমি হাসতে হাসতে শহীদ হয়ে গেছি। সবাই যখন মৃত্যুটাকে ভীষণ ভয় পায়, আমি তখন হাসতে হাসতে আল্লাহর কাছে ভীষণ সন্তুষ্টি নিয়ে পৌঁছাতে চাই।”

সাম্প্রতিক সময়ে এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদি। তাঁর এই কথাগুলোই যেন বাস্তবে ফলে গেল—যেন আল্লাহ তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করলেন। ইনসাফের লড়াইয়ে শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) জুমা-বাদ তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। পরের শুক্রবার (বৃহস্পতিবার রাত, ১৮ ডিসেম্বর) তিনি হাসতে হাসতে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মানুষ মুনাজাতে অশ্রু ঝরিয়েছেন ওসমান হাদির শাহাদাত কবুলের দোয়ায়; জানাজায় সমবেত হয়েছেন দশ লক্ষাধিক মানুষ।

কিন্তু ৩২ বছরের এই ছোট্ট জীবনে ওসমান হাদি কী এমন করেছিলেন, যা তাঁর শত্রুদের কাছে তাঁকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল?

প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চপেটাঘাত

ওসমান হাদি ছিলেন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। কিন্তু রাজনীতিকে তিনি কখনো ক্ষমতা গ্রহণের সিঁড়ি হিসেবে দেখেননি। এমনকি ৫০০ ভোট পেলেও খুশি হতেন—এমন কথাও তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায়। তিনি চেয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন, যার সূচনা করেছিলেন নিজেই।

লাইভে এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “আমি এমপি হলে আপনাদেরই লাভ। সুতরাং আমার এমপি হওয়ার যাবতীয় খরচ আপনারাই দেবেন। আমি আমার পকেট থেকে এক টাকাও খরচ করব না, আবার নির্বাচনের টাকা থেকেও এক টাকাও নেব না।” এজন্য তিনি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট উন্মুক্ত করে দেন। মানুষও সাড়া দিয়ে টাকা পাঠাতে শুরু করেন। সর্বশেষ ফেসবুক লাইভে এই টাকার হিসাবই দিয়েছিলেন হাদি।

যেখানে বছরের পর বছর এমপি প্রার্থীরা টাকা দিয়ে ভোট কেনে, সেখানে হাদির এই উদ্যোগ ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার গালে প্রচণ্ড এক চপেটাঘাত। হয়তো ভোট-কেনা রাজনীতিকরা চরম বিপাকেই পড়েছিলেন।

হাদি জনগণের কথা বলতে গিয়ে বারবার প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। যখন আমরা সবকিছু দলীয় রাজনীতির চশমায় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, হাদি তখন এর বাইরে এসে জনগণের কাতারে শামিল হন। কোনো রাজনৈতিক আদর্শের কাছে নিজের মাথা বিক্রি করেননি তিনি। ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে ‘কে অখুশি হবে’—সে চিন্তা তাঁকে কখনো করতে হয়নি।

দলীয় পতাকার নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ বিপ্লবীর জীবন। জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন কঠিন সত্য। এক লাইভ টকশোতে তিনি সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন—রাস্তার মোড়ে মোড়ে ‘এমপিদের কাজ’ শিরোনামে বিলবোর্ড লাগাতে। এমপিদের কাজ যে রাস্তাঘাট বা স্কুল-কলেজ করা নয়—এই কথাটি হাদির আগে আর কে বলেছে এমন দীপ্ত কণ্ঠে?

হাদি নিয়ম ভাঙতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থায় রাজনীতি করা মানুষদের জন্য কি এই আন্দোলন স্বস্তিকর ছিল? সাধারণত কেউ যখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন অন্যায় তার কাছে আর অন্যায় মনে হয় না। তখন কেউ যদি সেই অনিয়মের ‘নিয়ম’ ভাঙতে চায়, প্রচলিত ব্যবস্থা তাকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে প্রচলিত ধারার রাজনীতিবিদদের কাছেও হাদি হয়ে ওঠেন বিপজ্জনক।

ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন

ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ওসমান হাদি ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনায় তিনি তীব্র ভারতবিরোধী বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেন।

শুধু ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেই নয়, দেশবিরোধী যেকোনো শক্তির বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলেছেন। হাদি বলেছিলেন, “জীবন যাবে, তবুও দেশপ্রেমের প্রশ্নে আপস করব না। পুরো দুনিয়া লিখে দিলেও দেশের সঙ্গে, জমিনের সঙ্গে গাদ্দারি করব না।”

এই আপসহীন আদর্শই হাদিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী যে বক্তব্য তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দিয়েছেন, তা যেন সাধারণ মানুষের না-বলা কথারই প্রতিধ্বনি। তিনি মানুষের ভয় ভেঙে দেন। হাদি জানতেন, ফ্যাসিবাদ শুধু একটি শাসনব্যবস্থা নয়—এটি একটি ভয়ের সংস্কৃতি। আর সেই ভয়ের সংস্কৃতিটাকেই তিনি চূর্ণ করেছিলেন।

কিন্তু ফ্যাসিবাদ যে বিষয়টিকে সবচেয়ে ভয় পায়, তা হলো প্রশ্ন। ওসমান হাদির অবিরাম প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়ে তারা আবারও আতঙ্কিত হয়। মৃত্যুভয় দেখিয়েও যখন তাঁকে চুপ করানো যায়নি, তখন তাঁকে সরিয়ে ফেলাকেই তারা নিজেদের নিরাপত্তা হিসেবে বেছে নেয়। টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন হাদি।

কিন্তু ফ্যাসিস্ট ও আধিপত্যবাদী শক্তি বুঝতে পারেনি—ওসমান হাদি ইতোমধ্যেই ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে দিয়েছেন। যারা কথা বলতে ভয় পেত, তিনি তাদের কণ্ঠ খুলে দিয়েছেন; যারা রাস্তায় নামতে ভয় পেত, তাদের রাস্তায় নামতে শিখিয়েছেন। তাই হাদিকে হত্যা করা মানে কেবল একজন মানুষকে হত্যা করা নয়—এটি ছিল প্রতিবাদ ও ইনসাফের ভাষাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা।

কিন্তু ইতিহাস বলে, এই ভাষা স্তব্ধ করা যায় না। বিপ্লবীরা মারা যায় না—তারা ছড়িয়ে পড়ে। শাহাদাতের তামান্না বুকে নিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যে লড়াইয়ে ওসমান হাদি নেমেছিলেন, সে লড়াই তিনি শহীদ হয়ে শেষ করেননি—বরং শুরু করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছে আরও লক্ষ লক্ষ হাদি।

 

লেখক: সভাপতি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দ্যা ঢাকা ডায়েরি পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।