বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পিংক বাস ও নারী নিরাপত্তা: স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি বনাম দীর্ঘমেয়াদী সমাধান

Author

শামা মেহজাবিন , রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৩১ বার

সম্প্রতি বাংলাদেশে পিংক বাস সার্ভিস চালু করা নিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকে এর প্রশংসা করছেন, অনেকে নানা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। আমার মতে উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তবে এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে একটি ধাপ মাত্র। এই পর্যন্ত করেই রাষ্ট্রের তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার সুযোগ নেই।

একজন নারী হিসেবে বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে আমি দীর্ঘদিন যাবৎ নারী ড্রাইভারের অভাব অনুভব করেছি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারী যাতায়াতের সময়, বিশেষত অন্ধকার নামার পর, নারী চালকদের গাড়িতেই অধিকতর নিরাপদ অনুভব করবেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে যানবাহন চালনার ক্ষেত্রটিতে এখনও পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য। নারী ড্রাইভার তেমন একটা দেখাই যায় না। তাই অস্বস্তি বোধ করলেও নারীদের বাধ্য হয়ে পুরুষচালিত গাড়িতেই উঠতে হয়।

এমতাবস্থায় পিংক বাস সার্ভিস হতে পারে এই সমস্যার তাৎক্ষণিক একটি সমাধান। পুরুষচালিত গাড়িতে অনিরাপদ বোধ করলে এখন নারীরা নারীচালিত গাড়িতে যাতায়াত করতে পারবেন। এতে নারীদের বাইরে চলাচল হবে আরেকটু স্বস্তিদায়ক।

আবার এটি নারীদের যানবাহন চালনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণেও উৎসাহ দেবে। নারীরা যখন দেখবেন পিংক বাসের ড্রাইভার, কন্ডাক্টররা দক্ষতার সাথে কাজ করছেন, উপার্জন করছেন, তাঁদের আশেপাশের অন্য নারীরা তাঁদের কারণে নির্ভয়ে যাতায়াত করতে পারছেন, তখন তারাও আস্তে আস্তে যানবাহন চালনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণে উৎসাহিত হবেন। এতে দেশের অর্থনীতির চাকা আরও সচল হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে লিঙ্গনির্বিশেষে যেকোনো মানুষই ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে গাড়ি চালান। ফলত সেসব দেশে রাইড শেয়ারিংয়ে নারী ড্রাইভার সিলেক্ট করার সুযোগও পান ব্যবহারকারীরা। কিন্তু বাংলাদেশে যেহেতু নারী ড্রাইভারই নেই, তাই এদেশের নারীরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কাজেই পিংক বাসের ব্যাপারটি থেকে উৎসাহিত হয়ে যদি নারীরাও পেশাদার ড্রাইভিংয়ে নামেন, তবে তা হবে দেশের বিপুলসংখ্যক নারীর জন্য একটি স্বস্তির ব্যাপার।

অনেকে বলছেন পিংক বাস সার্ভিস নারী-পুরুষকে আলাদা করছে (segregation)। কিন্তু এটি শুধু নারী-পুরুষকে আলাদা করা নয়, বরং যানবাহন চালনার ক্ষেত্রটিতে পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য দূর করে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করারও একটি প্রক্রিয়া। তাই পিংক বাস সার্ভিসকে শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। একে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে করে সামাজিক পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হবে। মানুষ যখন দেখবে নারীরা দিব্যি গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তখন তারা বুঝবে যে ড্রাইভিং শুধু পুরুষের পেশা নয়, সড়ক শুধু পুরুষের নয়, নারীরও।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। অনেকে উচ্চশিক্ষা থাকা সত্ত্বেও কোনো চাকরি পান না। এর পেছনে কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা যেমন দায়ী, তেমন মানুষের মানসিকতাও ভূমিকা রাখে। উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ যেকোনো পেশায় নামতে সংকোচবোধ করেন। কারণ অনেক পেশাকে সমাজে নিচু চোখে দেখা হয়। বাস ড্রাইভিংয়ের মতো পেশাকেও এতোদিন মানুষ অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত মানুষের কাজ হিসেবেই দেখে এসেছে।

এমতাবস্থায় আমরা দেখছি পিংক বাস ড্রাইভাররা এক একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। তাঁরা কেউ কেউ মাস্টার্স করে এসে বাস চালাচ্ছেন। এতে করে তাঁদের যেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে, তেমনি অন্যরাও বার্তা পাচ্ছেন যে গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা একটি সম্মানজনক পেশা। ফলে এখন থেকে উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ-তরুণীও ড্রাইভিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণে উৎসাহী হবেন। ফলে দেশে বেকারত্ব কমবে।

আবার এই নারীরা সমাজে একটি নতুন স্ট্যান্ডার্ডও স্থাপন করছেন। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বাসচালক বেশিদূর পড়াশোনা করেননি, যথেষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন, গাড়িগুলোও ফিটনেসবিহীন। সেখানে পিংক বাসের ড্রাইভার-কন্ডাক্টররা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত মানুষ। তাঁদের আচার-আচরণও যথেষ্ট মার্জিত। এতোদিন এদেশের মানুষ বাসচালকদের কাছ থেকে এই গুণগুলো সেভাবে আশা করেনি। কিন্তু এখন আমরা দেখছি বাসচালকরাও উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র হতে পারেন। এভাবে সমাজে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হচ্ছে।

তবে শুধু পিংক বাস পর্যন্ত থেমে গেলেই চলবে না। যে কারণে নারীরা এ দেশে এতো অনিরাপদ বোধ করেন সেগুলোকেও মোকাবেলা করতে হবে। পাবলিক প্লেসে ব্যাড টাচের শিকার হননি এরকম নারী হয়তো এদেশে খুঁজেই পাওয়া যাবে না। আর এই ব্যাড টাচ পুরুষরা করে থাকে বলেই পিংক বাসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ব্যাড টাচ ছাড়াও বিভিন্ন সময় বাসে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, এমনকি খুনেরও শিকার হন এদেশের নারীরা।

এগুলো বাস্তব সমস্যা। পিংক বাস এসব থেকে নারীদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ ব্যতীত শুধু কিছু বাস সার্ভিস চালু করে অবস্থার উন্নতি করা যাবে না। তাই প্রথমত স্কুল জীবন থেকেই বাচ্চাদের কনসেন্ট, গুড টাচ ব্যাড টাচ, নারীদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখা, প্রতিটি মানুষের বাউন্ডারিকে সম্মান করা, সামাজিক শিষ্টাচার ইত্যাদি শেখাতে হবে। এর পাশাপাশি জনপরিসরে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে৷ সামাজিক সচেতনতা এই পরিমাণ বাড়াতে হবে যে আশেপাশে কোনো মানুষকে যেকোনো ধরণের যৌন হেনস্তার শিকার হতে দেখলে যেন সাধারণ মানুষই তার প্রতিবাদ করে। এর জন্য সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক ক্যাম্পেইন চালাতে হবে।

অনেকে বলছেন পিংক বাস চালু করার বদলে এসব দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেয়াই দরকার ছিলো। কিন্তু আমি মনে করি পিংক বাস এবং এই পদক্ষেপগুলো পাশাপাশি চলা প্রয়োজন। কারণ নারীদের তাৎক্ষণিক একটি সমাধান যেমন দরকার, তেমনি দরকার সমাজে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন। তাই একটি বাদ দিয়ে আরেকটি করার বদলে দুটিই করতে হবে। যদি তা ঠিকঠাকভাবে করা যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আশা করি এমন দিন আসবে যখন পুরুষ ড্রাইভারের গাড়িতে যেমন নারীরা নির্ভয়ে উঠতে পারবেন, তেমনি নারী ড্রাইভারদের গাড়িতেও পুরুষরা চলাচল করতে পারবেন।

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।