গাভী বিত্তান্তের ছায়ায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে বক্তৃতা শেষে শিক্ষক যখন জিজ্ঞেস করেন, কারও কোনো প্রশ্ন আছে? তখন পুরো কক্ষে হঠাৎ অস্বস্তি নেমে আসে। কোনো এক শিক্ষার্থী হয়তো সূক্ষ্ম কোনো সংশয় বা ভিন্নধর্মী ভাবনা নিয়ে মুখ খুলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই শঙ্কার পেছনে তার অজ্ঞতার চেয়ে বেশি কাজ করে শ্রেণিকক্ষে বিরাজমান অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর। অথচ শ্রেণিকক্ষ হওয়ার কথা ছিল মুক্ত আলোচনার এক আনন্দময় পরিসর। সেখানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সহায়ক না হয়ে একধরনের কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শাসক ও শাসিতের সমীকরণে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বৈরী বাস্তবতায় শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকের ধারণাটিকে নতুন করে অনুধাবন করা জরুরি। একজন সত্যিকারের শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক কখনো নিজেকে জ্ঞানের একচ্ছত্র মালিক মনে করেন না; বরং তিনি শ্রেণিকক্ষে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে যেকোনো প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা থাকে এবং শিক্ষকের নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করাকেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসাহিত করা হয়। তিনি পরীক্ষার মূল্যায়ন কিংবা নম্বরকে শিক্ষার্থীর ওপর মানসিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন না। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ভীতি প্রদর্শনের পথ বেছে নেন না। তিনি শিক্ষার্থীকে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি দিয়ে ভাবতে শেখান, তার মধ্যে সমালোচনামূলক স্বাধীন চিন্তার বীজ বপন করেন। শিক্ষক যখন ক্ষমতার প্রভাবকে পাশে সরিয়ে নিজেকে শিক্ষার্থীর শিখনযাত্রার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তখনি প্রকৃত অর্থে একজন শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক হয়ে ওঠেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দর্শনের দিকে তাকালে এই সংকটের গভীরতা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলো জ্ঞান উৎপাদন, মৌলিক গবেষণা পরিচালনা, মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটানো এবং নাগরিক মূল্যবোধে বলীয়ান সচেতন মানবগোষ্ঠী তৈরি করা। যখন বিশ্ববিদ্যালয় তার এই ঐতিহাসিক সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়ে স্রেফ চাকরি কিংবা ডিগ্রি অর্জনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার বুদ্ধিবৃত্তিক লেনদেন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক এই দেউলিয়াত্ব শ্রেণিকক্ষ থেকে চিন্তার স্বাধীনতাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে এক যান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে।
উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ককে গভীরভাবে বুঝতে শিক্ষাবিদ রোল্যান্ড টর্মির উদ্ভাবিত বহুমাত্রিক কাঠামোর শরণ নেওয়া যায়। টর্মি তাঁর গবেষণায় শ্রেণিকক্ষের আবেগীয় সম্পর্ককে মূলত তিনটি প্রধান মাত্রায় ব্যাখ্যা করেছেন। এগুলো হলো সৌহার্দ্য বা উষ্ণতা, নিরাপত্তা বা আস্থা এবং কর্তৃত্ব বা সামাজিক অবস্থান। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যখন শ্রেণিকক্ষে উষ্ণতা ও আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার মাত্রাটি প্রাধান্য পায়, তখন শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কাঠামোতে শিক্ষকের হাতে কেন্দ্রীভূত অভ্যন্তরীণ নম্বর প্রদান, উপস্থিতির ভিত্তিতে নম্বর বণ্টন এবং থিসিস বা গবেষণা তত্ত্বাবধানের সুযোগ—বহু ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব চর্চার হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে যে আস্থার বন্ধন থাকার কথা, তা ভেঙে গিয়ে ভয়ের ওপর ভিত্তি করে এক অস্বাস্থ্যকর ক্ষমতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতার এই বিকৃত চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে আহমদ ছফার বিখ্যাত স্যাটায়ার উপন্যাস গাভী বিত্তান্তে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র উপাচার্য মিঞা মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি এবং ক্ষমতার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া চরিত্রগুলো দেখিয়ে দেয়, কীভাবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি রাজনৈতিক তোষামোদ, দলাদলি ও ক্ষমতার লড়াইয়ের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তখন উপাচার্য-শিক্ষকদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার আনুগত্য অর্জন ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি এবং সেখানে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ‘গাভী বিত্তান্ত’ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের নামে চলা তোষামোদের সংস্কৃতি, শিক্ষকদের নীতিগত পতন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্বের এক নির্মম দর্পণ তুলে ধরেছে।
ছফার অপর কালজয়ী প্রবন্ধসংকলন বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী-শিক্ষকদের রাজনৈতিক ক্ষমতার আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন। ছফার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিক্ষকরা যখন রাষ্ট্রীয় কিংবা দলীয় ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশ করে তোষামোদকে নিজেদের ভাগ্য বদলের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন, তখন তাঁরা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন। যে শিক্ষক নিজেই ক্ষমতার দাসত্ব গ্রহণ করেছেন, সত্য উচ্চারণের সাহস হারিয়ে সুবিধাবাদের চর্চা করেন, তাঁর পক্ষে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখানো সম্ভব নয়। ক্ষমতার ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাওয়া এসব শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। কারণ তাঁদের কাছে শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের চেয়ে ক্ষমতাকে সন্তুষ্ট রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক গড়ে না ওঠার পেছনে তবে কি শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগত চরিত্র বা মানসিকতাই দায়ী? অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর পেছনে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত সংকট। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগে দলীয় আনুগত্য কিংবা স্বজনপ্রীতি দক্ষতার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। এছাড়া পদোন্নতির প্রক্রিয়াতেও রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া বিদ্যমান। এর পাশাপাশি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী সংবলিত বিশাল শ্রেণিকক্ষ শিক্ষকদের প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও সীমিত করে দেয়। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সঠিক কৌশল, মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ গড়ে তোলার পদ্ধতি কিংবা আধুনিক পেডাগোজি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আরও একটি বড় সমস্যা হলো ভালো গবেষক হওয়া আর ভালো শিক্ষক হওয়ার মধ্যকার পার্থক্যকে অনুধাবন করতে না পারা। জাতীয় একাডেমিক নীতিমালায় বহু ক্ষেত্রে শিক্ষকের পদোন্নতি নির্ধারিত হয় গবেষণা কিংবা প্রকাশনার ওপর ভিত্তি করে। অথচ এখানে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষাদানের মানকে অবমূল্যায়ন করা হয়। উচ্চমানের গবেষণা প্রবন্ধ লিখলেই একজন শিক্ষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা কিংবা তাদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা অর্জন করেন না। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক পেডাগজিক্যাল ট্রেনিং বা শিখন-শেখানো কলাকৌশল বিষয়ক প্রশিক্ষণের চরম ঘাটতি রয়েছে। ফলশ্রুতিতে তরুণ শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন কোনো শিখনজ্ঞান ছাড়াই; তারা স্বভাবতই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষককেন্দ্রিক ও শাসনভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরেন। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরির বদলে গড়ে ওঠে কর্তৃত্বনির্ভর এক শিক্ষাব্যবস্থা।
উচ্চশিক্ষার শ্রেণিকক্ষে যখন একজন শিক্ষার্থী প্রচলিত পাঠ্যবই কিংবা শিক্ষকের ক্লাসে দেওয়া বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী কোনো দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চায়, তখন সেই উদ্যোগকে জ্ঞানচর্চার অংশ হিসেবে স্বাগত জানানো হয় না। বরং সেটিকে শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রতি একধরনের আনুগত্যহীনতা হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই মানসিকতা মূলত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষককেন্দ্রিক শিখন পদ্ধতিরই ফল। শিক্ষক নিজেকে জ্ঞানের একচ্ছত্র উৎস এবং শিক্ষার্থীকে নিছক এক নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করেন। শ্রেণিকক্ষে গ্রেড ও মূল্যায়নের ওপর শিক্ষকের একক নিয়ন্ত্রণ থাকায় শিক্ষার্থী কোনো একাডেমিক ক্ষতির আশঙ্কায় নিজের স্বাভাবিক সংশয় প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। ফলশ্রুতিতে শ্রেণিকক্ষ উন্মুক্ত আলোচনার কেন্দ্র না হয়ে স্রেফ তথ্যের নিষ্ক্রিয় গ্রহণের পরিসরে পরিণত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার বিকাশকে মারাত্মকভাবে রুদ্ধ করে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর স্থায়ী রূপ নেওয়ার মূল কারণ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসে বিরাজমান উচ্চমাত্রার পাওয়ার ডিস্ট্যান্স বা ক্ষমতার বৈষম্য। ক্লাসের বাইরে শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত রাখা, পদমর্যাদাগত দূরত্বের অহেতুক মহড়া এবং একাডেমিক ফলাফলের ধারাবাহিক ভীতি শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে শিক্ষকের কাছ থেকে বহুদূরে ঠেলে দেয়। শ্রেণিকক্ষে শাসনকেন্দ্রিক পরিবেশ বিরাজ করলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে কোনো সুদৃঢ় মেন্টরশিপ গড়ে উঠতে পারে না। একজন সহানুভূতিশীল ও পথপ্রদর্শকসুলভ মেন্টরের অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক সংকট কিংবা জীবনমুখী সিদ্ধান্তহীনতায় কোনো আলোর দিশা খুঁজে পায় না। ফলে সামগ্রিক শিখনপ্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকতার এক যান্ত্রিক চক্রে বন্দি হয়ে পড়ে।
শিক্ষকের ইতিবাচক মানসিকতা কীভাবে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়িয়ে তোলে, তা বিভিন্ন আধুনিক গবেষণায় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া আবেগীয় ও একাডেমিক সমর্থন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ, শেখার আগ্রহ এবং সামগ্রিক একাডেমিক ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। একইভাবে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষক যখন একপাক্ষিক বক্তৃতা না দিয়ে দ্বিমুখী বা ইন্টারঅ্যাকটিভ পাঠদান পদ্ধতি অনুসরণ করেন এবং সময়মতো গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করেন, তখন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণের স্বতঃস্ফূর্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। এসব তথ্য নিশ্চিত করে যে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ কোনো কাল্পনিক চাওয়া নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের শিখনফল উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রাতিষ্ঠানিক মান নিশ্চিতকরণ সেল (আইকিউএসি) কিংবা ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা (ওবিই) কাঠামোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও বাস্তবচিত্রে এর সুফল মিলছে অত্যন্ত সামান্য। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে কাগজে-কলমে স্টুডেন্ট ফিডব্যাক বা শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করা হলেও বাস্তবে তা একটি নির্জীব আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। শিক্ষকের প্রশাসনিক প্রভাবের ভয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সাহস দেখাতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং ও জবাবদিহিতার এমন শিথিলতার কারণে আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের অনমনীয় আচরণ অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক গড়ে না ওঠার পেছনে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের ভুল মানদণ্ডও গভীরভাবে দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষকের একাডেমিক সফলতা মূলত তাঁর প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা, সাইটেশন এবং প্রশাসনিক পদে আসীন হওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। কিন্তু একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কতখানি সংবেদনশীল ছিলেন, তিনি কতজন শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন কিংবা কতজনের মধ্যে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি জাগিয়ে তুলেছেন, তা পরিমাপের কোনো সূচক সেখানে নেই। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাদানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবমূল্যায়ন করার এই প্রবণতা শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষের প্রতি যত্নশীল হওয়ার চেয়ে নিজস্ব একাডেমিক পোর্টফোলিও ভারী করার দিকে ধাবিত করে।
এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন—শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়ার অর্থ এই নয় যে শিক্ষাগত মানদণ্ড শিথিল করা কিংবা প্লাজিয়ারিজম, নকল ও একাডেমিক অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া। একজন প্রকৃত শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক নীতির প্রশ্নে হবেন চরম আপসহীন, কিন্তু আচরণে হবেন অত্যন্ত মানবিক, ন্যায্য ও সংবেদনশীল। তিনি পাঠ্যক্রমের গুণগত মান বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখবেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার অধিকার এবং ভুল থেকে শেখার প্রক্রিয়াকেও সম্মান করবেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীবান্ধবতা হলো এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ চর্চা, যেখানে শাস্তির ভীতি দেখিয়ে অনুগত করে তোলার বদলে যুক্তিসঙ্গত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে সহায়তা করা হয়।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বহুমুখী পদ্ধতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় নতুন যোগ দেওয়া প্রতিটি শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক পেডাগজিক্যাল ট্রেনিং বা শিক্ষাদান কলাকৌশল বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাঁরা আধুনিক শিখন-পদ্ধতি ও মানবিক যোগাযোগের কৌশলে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে শিক্ষকের পাঠদান-আচরণ সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল ফিডব্যাক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তবে শুধু শিক্ষকের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের নিজেদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা অর্জন, একাডেমিক সততা বজায় রাখা এবং শ্রেণিকক্ষের মুক্ত পরিবেশে সম্মানজনকভাবে যুক্তিতর্কে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
অবশেষে সেই মৌলিক প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক—বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কার এবং এর সাফল্য কিসে নিহিত? চিন্তাবিদ আহমদ ছফা তাঁর ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ ও ‘গাভী বিত্তান্ত’ রচনায় যে প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্বের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল মর্যাদা ইটের দালান কিংবা ডিগ্রির সংখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় সনদপত্র সরবরাহের কোনো কারখানা হতে পারে না; বরং এর মূল সার্থকতা নিহিত শিক্ষার্থীর মননজগতে পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে সহায়তা করার মধ্যে। শিক্ষকরা যখন ক্ষমতার মোহে দাসত্বের মানসিকতা ত্যাগ করে শিক্ষার্থীর মেধা ও মননের বিকাশে সার্থক সহযাত্রী হয়ে উঠবেন, তখনই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক দায় শোধ করতে সমর্থ হবে।
লেখক: রাকিবুল হাসান মুন্না
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
