প্রথম নিরক্ষরমুক্ত জেলা মাগুরা: উন্নয়নে পিছিয়ে কেনো?
বাংলাদেশের ইতিহাসে মাগুরা একসময় একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচিতে অগ্রণী ভূমিকার কারণে এই জেলাকে “প্রথম নিরক্ষরমুক্ত জেলা” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই অর্জন আজ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় তেমন প্রভাব রাখতে পারেনি। বরং শিক্ষা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর বিভিন্ন সূচকে মাগুরা এখনও পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাগুরা জেলার সাক্ষরতার হার প্রায় ৭২.২১%, যেখানে জাতীয় গড় প্রায় ৭৪–৭৫%। অর্থাৎ, যে জেলা একসময় নিরক্ষরমুক্ত হওয়ার দাবি করেছিল, বর্তমান সময়ে সেই জেলা জাতীয় গড়ের নিচে অবস্থান করছে। এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—“নিরক্ষরমুক্ত” ঘোষণাটি কি ছিল টেকসই উন্নয়নের সূচনা, নাকি সাময়িক একটি অর্জন?
শিক্ষা অবকাঠামোর দিক থেকে মাগুরায় প্রতিষ্ঠানসংখ্যা কম নয়। জেলায় প্রায় ১৪৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৬টি কলেজ, ৭২টি মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সংখ্যা থাকা সত্ত্বেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। শিক্ষক সংকট, আধুনিক ল্যাব ও প্রযুক্তির অভাব এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। অন্যদিকে, শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাগুরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত এখনো ভারসাম্যপূর্ণ নয় এবং উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক শিক্ষার্থীকে ঢাকাসহ বড় শহরে চলে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে, যাকে “অভ্যন্তরীণ ব্রেইন ড্রেইন” বলা যেতে পারে।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে মাগুরার চিত্র আরও হতাশাজনক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাত্র ৪টি এবং মাঝারি শিল্প মাত্র ২টি, যা একটি জেলার অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। এতে করে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নেও রয়েছে স্পষ্ট বৈষম্য। এই জেলায় প্রায় ১৬২৬ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা এখনো বিদ্যমান, যেখানে পাকা সড়কের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। আশপাশের প্রায় সব জেলায় রেল সংযোগ থাকলেও মাগুরাতে এখনো কোনো রেল যোগাযোগব্যবস্থা চালু হয়নি। বহু পূর্ব থেকে রেল সংযোগ চালু হওয়ার কথা থাকলেও কাজ এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে।
এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। জনসংখ্যা কাঠামোর দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাগুরার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষের বেশি, যার একটি বড় অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী।
উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন ও তদারকির অভাব প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। এতে করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয় না। তবে সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং প্রবাসী আয়—এই তিনটি খাতকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে মাগুরা নতুন করে এগিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো গেলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, “প্রথম নিরক্ষরমুক্ত জেলা” হিসেবে মাগুরার পরিচয় একটি গৌরবময় ইতিহাস হলেও সেটি ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বাস্তবমুখী উন্নয়ন কৌশল। অন্যথায়, এই ঐতিহাসিক অর্জন কেবল একটি স্মৃতিতে পরিণত হবে, যার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার কোনো সংযোগ থাকবে না।
