শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সোনালী দিনের শেষে

Author

মিম বিনতে ইব্রাহিম , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৩২ বার

মাঠটার নাম কেউ জানত না। তবে দূর থেকে মাঠটা দেখলে মনে হতো, মাটির ওপর কেউ যেন এক মুঠো সোনালী রোদ ছড়িয়ে দিয়েছে। সারি সারি সূর্যমুখী ফুটে ছিল সেখানে। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু সূর্যমুখী আর সূর্যমুখী। লম্বা সবুজ ডাঁটায় মাথা তুলে মুখভরা সোনালী পাপড়ি নিয়ে যেন তারা প্রতিদিন সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। দলে দলে মৌমাছিরা আসে, ফুলের পাপড়ি ছুঁয়ে যায় রঙিন প্রজাপতিরা। পরিশ্রান্ত পথিকও তাদের সৌন্দর্যে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ায়। বাতাসও যেন তাদের একটু বেশি স্নিগ্ধ ছোঁয়া দিয়ে বয়ে যায়।

সেই মাঠেই একদিন একটি ছোট্ট ফুলের চারা জন্ম নিল। সে নিজেকে আলাদা বলে ভাবেনি কারণ তার চারপাশে যারা ছিল, তারা সবাই ছিল সূর্যমুখী। তাই সে ধরে নিয়েছিল একদিন সে ও তাদের মতোই হবে। হয়তো সে এখনো ছোট। তার পাপড়িগুলো এখনো ঠিকমতো বড় হয়নি। তবে আর কিছুদিন পরেই তার মাথাতেও ফুটে উঠবে সেই বিশাল, উজ্জ্বল সোনালী মুকুট।

এই আশাতেই সে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। ঝুম বৃষ্টিতে সে ভিজত। নরম রোদে সে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকত। গোধূলির শেষ আভা বিলীন হয়ে আধার নামলে সে অপেক্ষা করত সোনালী প্রভাতের। কারণ সে মনেপ্রাণে অপেক্ষা করছিল সূর্যমুখী হয়ে প্রস্ফুটিত হওয়ার জন্য। তার সরল হৃদয়ে কেবল একটাই ছবি ছিল যে, একদিন সে ও  সূর্যমুখী হয়ে মাথায় সোনালী মুকুট পরে, স্বমহিমায় দীপ্তি ছড়িয়ে এই সোনালী প্রান্তরের অংশ হবে।

কিন্তু যেদিন সত্যিই তার ফুলের উন্মোচন হলো, সেদিন তার মনে হলো, পৃথিবী যেন তাকে নিয়ে একটা নিষ্ঠুর ভুল করেছে। কারণ সে সূর্যমুখী হয়নি। সে ছিল একটি বুনোফুল।

তার ছোট ফুলের পাপড়িগুলো কোমল কিন্তু একটু এলোমেলো। রংটাও তেমন উজ্জ্বল নয়। তার ডাটিটা সূর্যমুখীদের মতো লম্বা নয়, মাথায়ও নেই সেই বিশাল সোনালি মুকুট। সূর্যমুখীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে খুব সাধারণ মনে হলো। সে ভাবল, কোথাও নিশ্চয়ই ভুল হয়েছে।

তাকে দেখে কারও চোখ আটকে যায় না। তার কোমল পাপড়ি তে রঙিন প্রজাপতিরা ভিড় জমায় না। তার পাশে দাঁড়ানো সূর্যমুখীগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর সে আরও ছোট। তাই সে হীনম্মন্যতায় নিজের দিকে তাকানো বন্ধ করে দিল।

সে কেবলই ভাবত, সূর্যমুখীদের যেন একটা উদ্দেশ্য আছে। তারা লম্বা ডাটি তে ভর দিয়ে তাদের সোনালী মুকুট সূর্যের দিকে মুখ করে রাখে, আর পুরো মাঠটাকে সোনালি করে তোলে। কিন্তু সে? সে তো শুধু সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। নেই তার কোনো সোনালী মুকুট কিংবা এমন কোনো সৌন্দর্য যা সুদূর পথিকের এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানোর কারণ হবে।

দিনের পর দিন সে নিজের সঙ্গে সূর্যমুখীদের তুলনা করতে লাগল। আফসোস করতে লাগল, কেন সে সূর্যমুখী হয়ে জন্মাল না। কেন পৃথিবী তাকে সূর্যমুখীদের মতো রং দিল না, কেন তার জন্যও এমন সুন্দর নিয়তি লেখা হলো না। ধীরে ধীরে সে নিজের সবকিছুকেই অপছন্দ করতে শুরু করল।

তারপর একদিন ঋতু বদলাতে শুরু করল। রোদের উষ্ণতা কমে গেল। বিপরীত দিক থেকে বাতাস বইতে লাগলো। সূর্যমুখীদের সোনালি মুখ ধীরে ধীরে নুয়ে পড়ল। পাপড়িগুলো বিবর্ণ হয়ে এল। একে একে তারা মাটির সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। যে মাঠ একসময় সোনালি মুখে ভরে থাকত, তা ধীরে ধীরে মলিনতায় মুখ ঢেকে একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

বুনোফুলটি শুধু তাকিয়ে রইল। তার কাঙ্ক্ষিত সেই সোনালী মুকুটধারী সূর্যমুখীদের অস্তমিত হওয়ার দৃশ্য সে নীরবে প্রত্যক্ষণ করলো। কারণ সে তখনও সেখানে ছিল। এতদিন ধরে যে ফুল হওয়ার স্বপ্ন সে দেখেছিল, শেষ পর্যন্ত সে তা হয়নি। তবুও সে ফুটে ছিল। শীতল বাতাস তাকে দোলাল, বৃষ্টি তাকে ভিজিয়ে দিল। তবু প্রতিটি সকালেই সে আবার ফুটে উঠল।

এতদিন পর সে নিজেকে প্রথমবার দেখল অন্য কারও পাশে দাঁড় করিয়ে নয়, শুধু নিজের মতো করে। সে খেয়াল করলো, তার পাপড়ি সূর্যমুখীর মতো সোনালী ও উজ্জ্বল নয়, কিন্তু তাতে আছে স্নিগ্ধ এক কোমলতা। তার ডাঁটিটা সরু, তবে তেমন দুর্বল নয় যেমনটা সে ভেবেছিল কারণ এতদিন ধরে সে যে টিকে আছে, সেটাই তার প্রমাণ বহন করে। তার রং খুব উজ্জ্বল নয়, তবু ভোরের আলোয় তার নিজস্ব এক সৌন্দর্য আছে।

সেদিন ঠিক সেই মুহূর্তে সে উপলব্ধি করল যে, সে ভুল ফুল হয়ে জন্মায়নি। সে শুধু এতদিন ধরে নিজেকে ভুল ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছে এসেছে।  সূর্যমুখীদের ছিল তাদের ঋতু। তারও ছিল তার নিজের ঋতু। সূর্যমুখীর ঋতু শেষ হয়েছে। তারটা হয়তো এখন শুরু।

বুনোফুলটি মাথা তুলল। এই প্রথম তার আর সূর্যমুখী হতে ইচ্ছে হলো না। সে বুনোফুল হয়েই প্রস্ফুটিত হয়ে থাকতে চাইল। তাই সে সগর্বে নিজের সৌন্দর্য কে আলিঙ্গন করে নিজের স্নিগ্ধ কোমল পাপড়ি বিস্তীর্ণ নীল আকাশের নিচে মেলে রাখলো। ঐ নীল আকাশের বিশালতার নিচে দাঁড়িয়ে সেদিন সে বুঝেছিল, এই পৃথিবীতে প্রতিটি ফুলের সূর্যমুখী হয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই। কারণ প্রতিটি ফুলের রয়েছে নিজস্ব মাহাত্ম্য।

কেউ রোদের দিকে মুখ তুলে সোনালী রং মেখে গৌরব ছড়িয়ে বড় হয়। আর কেউ মাটির কাছাকাছি থেকে নিঃশব্দে টিকে থেকে নিজের ঋতু খুঁজে নেয়।

কেউ হয়তো খুব তাড়াতাড়ি বিকশিত হয়। আর কেউ অন্যদের ঝরে পড়ার পর আত্মউন্মেষে উদ্ভাসিত হয়ে টিকে থাকে নীরবে নিভৃতে। কারো সোনালী সৌন্দর্যে রঙিন প্রজাপতিরাও বিমোহিত হয়ে দিক হারিয়ে ফেলে। আবার তারাই কারো নীরব সৌন্দর্যের পাশ কাটিয়ে উড়ে চলে যায়। কিন্তু তাতে কারো সৌন্দর্য এক বিন্দুও কমে যায় না।


সেদিন থেকে বুনোফুলটি আর সূর্যমুখী হতে চাইল না। সে বুনোফুল হয়েই সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সে অন্যের চোখে অসাধারণ হয়ে উঠেছে বলে নয় বরং নিজের ভেতরের অসাধারণটুকু সে অবশেষে দেখতে পেরেছিল বলে। সে বুঝেছিল, প্রতিটি ফুলের সৌন্দর্য তার নিজস্বতায়। অন্য কোনো ফুল কখনোই তার নিজস্ব সৌন্দর্যের মাপকাঠি হতে পারে না।

লেখক: জেনারেল মেম্বার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।