ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি : সম্ভাবনা, সংকট ও উত্তরণের পথ
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি: সম্ভাবনার, সংকট ও উত্তরণের পথ
ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজগুলো নিয়ে গঠিত হয় “ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি”। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার জন্য “ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ, ২০২৬” গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি (অধ্যাদেশ জারি হয় ৮ ফেব্রুয়ারি, তবে ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়)। নির্বাচিত সরকার আসার পর ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপিত হয় এবং জাতীয় সংসদ কর্তৃক আইন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়। এটি বাংলাদেশের ৫৭তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পঞ্চম স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য দূর করা, আধুনিক ও গবেষণানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানোর উদ্দেশ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম মাল্টি-ক্যাম্পাস ইউনিভার্সিটি হওয়ায় এর সংকট সমাধান কিছুটা জটিল।
এটি একটি নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অবকাঠামোগত কাঠামো ঠিক করে তারপর ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পাসের আগে, এমনকি অধ্যাদেশ জারির আগেই শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হয়। সাধারণত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়; কিন্তু ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি যেহেতু সরকারি সাতটি কলেজ নিয়ে গঠিত, তাই পুরোপুরি না হলেও এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। এটি দিয়েই পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—এটি কোন কারিকুলামে বা পাঠ্যক্রমে পরিচালিত হবে? অধ্যাদেশ জারির আগে বলা হয়েছিল এটি স্কুলিং পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।এটি অধ্যাদেশের ৭(৪) ধারায় স্কুল পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে । বিশ্ববিদ্যালয়টি যেহেতু একটি মাল্টি-ক্যাম্পাস ইউনিভার্সিটি, তাই প্রতিটি কলেজ ক্যাম্পাসকে আলাদা আলাদা অনুষদে ভাগ করলে ভালো হবে। যদি স্কুলিং পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়, তবে তা সবচেয়ে ভালো ফল বয়ে আনবে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকাকালীন কারিকুলামেই পাঠদান চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাগ্য মূলত নির্ভর করছে এই কারিকুলামের ওপর। যদি কোনো মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়, তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ভালো করার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সেশনজট। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত অবস্থায় ভর্তি নেওয়া হয়। বিভিন্ন জটিলতার পর বারবার তারিখ পিছিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হয় এবং ক্লাস শুরু হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে। ফলে শুরুতেই একটি সেশনজটের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সম্মানিত উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সাথে একমতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, “২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের কোনো সেশনজট থাকবে না। আগস্ট মাসের মধ্যেই প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন সমস্যার কারণে যে সময় নষ্ট হয়েছে, তা প্রতি শিক্ষাবর্ষে কয়েক মাস কমিয়ে ঠিক করে দেওয়া হবে।” কিন্তু বাস্তবে আগস্ট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পরীক্ষার রুটিন প্রকাশিত হয়নি, যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। এদিকে ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে; ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারাও সেশনজটের মুখে পড়বে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আগেই ক্লাস শুরু হয়েছে এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষাও শেষ হয়েছে। এদিক থেকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি পিছিয়ে রয়েছে।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে সেশনজট নিরসনে কিছু দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে—”২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কত মাস পিছিয়ে রয়েছে, তার একটি হিসাব করতে হবে। এরপর প্রতিবছরে অল্প অল্প সময় কমিয়ে এনে (অর্থাৎ ১২ মাসের বছরকে ৯-১০ মাসে নামিয়ে এনে) এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হবে।” এটি বাস্তবায়ন করা গেলে এই দুই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সেশনজটের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। আর স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হলো—”এর পর থেকে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একই সময়ে ভর্তি পরীক্ষা নিতে হবে।” ইতিমধ্যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার খসড়া রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এই দুটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার্থীদের সেশনজট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি সংকট হলো প্রশাসনিক লোকবল। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো উদ্যোগ নিতে চাইলে পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখনো প্রশাসনিক অনেক পদ খালি রয়েছে। যদি ফাঁকা পদগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে গতি আসবে।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে পাঠদান করছেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাত কলেজের সকল শিক্ষককে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়েছে। এরপর কী সিদ্ধান্ত আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সম্ভবত এই শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে।
প্রশাসন কিছু ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি দেশের একটি অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মেরাজুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
