বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কোচিং কি শিক্ষার সহায়ক নাকি লাভজনক ব্যবসা?

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৬০ বার

https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-08-07&page=4&news=04_101

কোচিং কি শিক্ষার সহায়ক নাকি লাভজনক ব্যবসা?

শিক্ষা মানুষের চিন্তা, বিবেক এবং সৃজনশীলতা বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে, যেখানে শ্রেণিকক্ষের পাঠের পাশাপাশি কোচিং সেন্টার যেন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে। স্কুল-কলেজের পর কোচিং, পরীক্ষার আগে কোচিং, ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং, শিক্ষার প্রতিটি ধাপে গড়ে উঠেছে একটি সমান্তরাল বাজার। কোচিং কি শিক্ষার সহায়ক, নাকি শিক্ষাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি লাভজনক ব্যবসা? কোচিংয়ের প্রসঙ্গটি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং সেন্টারকে একটি আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাইরের কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিদ্যালয়ের ভেতরে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক পাঠদানের প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু কোচিং নির্ভরতার পেছনে শুধু কোচিং ব্যবসায়ীদের দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র সামনে আসে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, অভিভাবকের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা এবং আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কোচিং এখন আর বিকল্প নয়, প্রায় বাধ্যতামূলক নিয়তি। স্কুলে ক্লাস করার পরও শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে যেতে হয়। কারণ সেখানে পরীক্ষায় কীভাবে ভালো নম্বর পাওয়া যায়, কোন প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে উত্তর লিখতে হবে কিংবা কোন অধ্যায় থেকে বেশি প্রশ্ন আসতে পারে, তার ওপর বিশেষ শেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন থেকে সরে গিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল লাভের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এডুকেশন ওয়াচ ২০২৩- এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরে ব্যক্তিগত টিউশন ও কোচিংয়ে শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে এবং এ খাতে পরিবারের ব্যয়ও কম নয়। গবেষণাটির বিভি-ন্ন তথ্য থেকে বোঝা যায়, শহর ও গ্রাম দুই জায়গাতেই শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পাঠদানের ওপর নির্ভরতা রয়েছে, যদিও ব্যয় ও অংশগ্রহণের মাত্রায় পার্থক্য আছে। এখানেই আসে মেধা বনাম ব্যবসার প্রশ্ন। একজন শিক্ষার্থী যদি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়, তাহলে সে একাধিক বিষয়ে কোচিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষক নিতে পারে। কিন্তু নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীর পক্ষে একই সুযোগ পাওয়া কঠিন। ফলে শিক্ষার প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে মেধার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যে শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্য কমানোর কথা, সেটিই যদি অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বৈষম্য বাড়ায়, তাহলে তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়। কোচিং ব্যবসার আরেকটি সমস্যা হলো ‘নোটনির্ভর’ ও ‘কমননির্ভর’ শিক্ষার বিস্তার। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে কোনো বিষয় গভীরভাবে বোঝানোর পরিবর্তে পরীক্ষায় সম্ভাব্য প্রশ্ন, সাজেশন, শর্টকাট র্টকাট বা মুখস্থনির্ভর কৌশলের দিকে বেশি ঠেলে দেওয়া হয়। ঠেলে দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় হয়তো পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনে সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও সৃজনশীল চিন্তার দক্ষতা কতটা অর্জন করছে, সেটি কিন্তু প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্যদিকে কোচিং সেন্টারকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাঠ থেকে কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে কোচিং বা অতিরিক্ত সহায়তার মাধ্যমে উপকৃত হয়। বিশেষ করে বড় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যখন প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে সময় দিতে পারেন না, তখন অতিরিক্ত সহায়ক পাঠ প্রয়োজন হতে পারে। তাই সমস্যাটি অতিরিক্ত শিক্ষার শি প্রয়োজনীয়তায় নয়; বরং শিক্ষার একটি বাণিজ্যিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার মধ্যে। এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকে শক্তিশালী করা। একজন শিক্ষার্থী যেন স্কুলে গিয়ে তার পাঠ্যবিষয় যথেষ্ট বুঝতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সহায়তা পায়। এটি নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা শনাক্ত করে বিদ্যালয়ের ভেতরেই ‘ইন-হাউজ’ সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম জোরদারের কথা বলা হয়েছে। তবে শুধু কোচিং বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এতে শিক্ষার্থীরা আরো অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত টিউশন বা গোপন কোচিংয়ের দিকে চলে যেতে পারে। তাই যেকোনো নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, নিয়মিত মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য অতিরিক্ত মনিটরিং এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদেরও নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে। সন্তানকে শুধু ‘এ প্লাস’ বা সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্য চাপ না দিয়ে তাকে জ্ঞান অর্জনের আনন্দ, বই পড়া, প্রশ্ন করা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার সুযোগ দিতে হবে। একটি পরীক্ষার ফল কখনোই একজন শিক্ষার্থীর পুরো মেধা বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও পেশাগত দায়িত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের বাইরের কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যক্তিগত আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা শিক্ষাব্যবস্থায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে নন-এমপিও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তার কথাও উঠে এসেছে, যা শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের মনোবলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোচিংনির্ভরতা আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি উপসর্গ। এর পেছনে আছে পরীক্ষার ফলের অতিরিক্ত চাপ, শ্রেণিকক্ষের সীমাবদ্ধতা, অভিভাবকের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক সংস্কৃতি। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষার্থীও কোনো ক্রেতা নন। মেধা যেন অর্থের কাছে পরাজিত না হয়, সেটিই একটি ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান শর্ত। কোচিংয়ের প্রয়োজন যদি থেকেই যায়, তা যেন শিক্ষার দুর্বলতা থেকে জন্ম না নেয়; বরং শিক্ষার্থীর বিশেষ প্রয়োজন পূরণের সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে থাকে। বিদ্যালয় যদি শিক্ষার মূল কেন্দ্র হয়, শিক্ষক যদি যথাযথ মর্যাদা ও দায়িত্ব নিয়ে পাঠদান করেন এবং মূল্যায়ন যদি মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে জ্ঞান ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়। তবেই কোচিংনির্ভরতার এই সংস্কৃতি ভাঙা সম্ভব। অন্যথায় শিক্ষার নামে আমরা হয়তো আরো বড় একটি বাজার তৈরি করব, কিন্তু প্রকৃত মেধা ও মনন তৈরি করতে পারব না।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।