বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মুদ্রাস্ফীতি ও মধ্যবিত্তের সংগ্রাম

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৩৬ বার

মুদ্রাস্ফীতি ও মধ্যবিত্তের সংগ্রাম

একটি পরিবারের উপার্জিত আয় যখন মাসের শুরুতেই শেষ হয়ে যায়, তখন অর্থনীতির বড় বড় পরিসংখ্যান হয়তো তার কাছে খুব বেশি অর্থ বহন করে না। তার কাছে অর্থনীতির বাস্তবতা হলো বাজারের ব্যাগে আগের চেয়ে কম পণ্য, সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে বাড়তি হিসাব, চিকিৎসার জন্য সঞ্চয় ভাঙার ভয় এবং মাসের শেষ সপ্তাহে ব্যয়ের তালিকা ছোট করার চেষ্টা ইত্যাদি। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আজ এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দিন অতিক্রম করছে, যেখানে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ শুধু খাবারের মধ্যে সীমাবদা নেই। বরং পোশাক, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন খাতেও এর প্রভাব রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি হলো সময়ের সঙ্গে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর বেড়ে যাওয়া। কিন্তু একজন মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এর অর্থ হয়তোবা আরও সরল। একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম জিনিস কেনা। গত বছর যে বাজার করতে ১০ হাজার টাকা প্রয়োজন হতো, এবার একই ধরনের বাজার করতে যদি তার চেয়ে বেশি টাকা লাগে। তখন নির্ধারিত বেতন অপরিবর্তিত থাকলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এভাবেই মুদ্রাস্ফীতি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাত্রার মানকে সংকুচিত করে। মুদ্রাস্ফীতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে সঞ্চয়ের ওপর। স্বাভাবিক সময়ে একটি পরিবার ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ জমাতে পারে। কিন্তু যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় দ্রুত বাড়ে, তখন সেই সঞ্চয়ের টাকা সংসারের খরচ মেটাতে ব্যবহার করতে হয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারের হাতে আর্থিক নিরাপত্তা কমে যায়। দীর্ঘদিন এভাবেচলতে থাকলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয়ের সম্পর্কটিও এখানে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। যদি কোনো কর্মীর বেতন ৫ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় ব্যয় ৮ শতাংশ বাড়ে, তাহলে কাগজে তার আয় বাড়লেও বাস্তবেক্রয়ক্ষমতা কমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতি শুধু অর্থনীতির সূচক ঠিক রাখার জন্য নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করতে হবে এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে যায়। তাই শুধু বেতন বৃদ্ধির হার নয়, প্রকৃত আয় বা মুদ্রাস্ফীতি সমন্বিত আয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটিও সামনে আসে। মধ্যবিত্তের জন্য আরও একটি বড় সমস্যা হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। আজকের আয় দিয়ে আজকের ব্যয় মেটানো গেলেও আগামী মাসে বাজারদর কত হবে, চিকিৎসায় কত খরচ হবেকিংবা সন্তানের শিক্ষাব্যয় কত বাড়বেতা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অনিশ্চয়তা মানুষকে সঞ্চয়ের বদলে তাৎক্ষণিক ব্যয়ের দিকে ঠেলে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বা কিস্তিনির্ভরতা বাড়ায়। তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতি শুধু অর্থনীতির সূচক ঠিক রাখার জন্য নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হলে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করতে হবে এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে। মধ্যবিত্তকে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখা হয়। তারা ভোগ করে, সঞ্চয় করে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে সচল রাখে। কিন্তু এই শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা যদি দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকে, তাহলে তার প্রভাব শুধু পারিবারিক জীবনে সীমাবদ্ধ থাকবেনা; সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম শর্ত তাই শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে দেওয়া। মুদ্রাস্ফীতি শেষ পর্যন্ত কোনো বিমূর্ত সংখ্যা নয়। এর প্রতিটি শতাংশের পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের বদলে যাওয়া বাজারের তালিকা কমে যাওয়া সঞ্চয়, স্থগিত করা কোনো প্রয়োজন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন কোনো দুশ্চিন্তা। তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু মূল্যসূচক কমানো নয়; এর অর্থ হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা। মধ্যবিত্তের সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।