উত্তম চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ
ইসলাম মানবজাতির জন্য পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মানব জীবনের জন্য প্রয়োজন এমন কোনো দিক নেই যা ইসলামে বর্ণনা করা হয়নি। আল্লাহ, মানুষ কিংবা নিজের সাথেই একজন মানুষের আচার-আচরণ কিরূপ হবে ইসলাম তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে অত্যাধুনিক চিত্র অঙ্কন করে দিয়েছে। আখলাক আরবি শব্দ যার অর্থ চরিত্র। আখলাক বা চরিত্র হলো একজন মানুষের আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, কথাবার্তা, জীবনযাপনের সমষ্টি। আখলাক দুই প্রকার। আখলাকে হামিদা বা উত্তম চরিত্র এবং আখলাকে যামিমা বা নিকৃষ্ট চরিত্র।
একজন মুসলমান যখন ইসলামী অনুশাসন মেনে চলেন, ইসলামী আচার-শিষ্টাচার যখন তার জীবনে প্রতিফলিত হয়, তখন সে মানবচরিত্রের সর্বোন্নত শিখরে পৌঁছে যায়। অপরদিকে কেউ যদি ইসলাম নির্ধারিত পথের ভিন্ন পথ অবলম্বন করে এবং কথিত আধুনিকতার নামে অশ্লীলতার জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দেয় তখন সে মানবচরিত্রের সর্বনিকৃষ্ট পর্যায়ে চলে যায়।
উত্তম চরিত্র হলো ঈমানের প্রতিফলন। এটি ব্যতীত ঈমানের প্রতিফলন হয় না। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যার চরিত্র উত্তম। (আবু দাউদ ও তিরমিজি)
প্রতিটি ইবাদত মানুষের উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায়। কিছু উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত না করার শিক্ষা দেয়। মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে। আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সূরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতে বলেছেন নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।
তেমনি রোজা মানুষকে সংযমী হতে শিক্ষা দেয়। যাকাত মানুষকে কৃপণতা, অহংকার, লোভ হতে বাঁচায়। হজ্জ মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি করে ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়। এইভাবে ইসলামের প্রতিটি ইবাদত মানুষের চরিত্রের উন্নতি সাধন করে থাকে।
ইসলামে মানুষের চরিত্র গঠনের জন্য কিছু মৌলিক বিষয় পরিলক্ষিত হয় যা মানবজীবনের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। মহান আল্লাহতায়ালা ও রাসূল সা. আমাদেরকে উত্তম চরিত্র গঠনের জন্য যেসব শিক্ষা দিয়েছেন তার মধ্যে সত্যবাদিতার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ কোরআনে সূরা আত-তাওবার ১১৯ নং আয়াতে বলেছেন হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা সততার পথ অবলম্বন করো। কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের পথ দেখায়। (মুসলিম) এ ব্যাপারে তিনি আরো বলেন, সত্য হলো প্রশান্তির মাধ্যম এবং মিথ্যা হলো দুশ্চিন্তা ও ভয়ের উৎস। উত্তম চরিত্র গঠনের আরেকটি দিক হলো আমানতদারিতা। মহান আল্লাহতায়ালা কোরআনের সূরা নিসার ৫৮ নং আয়াতে বলেন, হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত তার হকদারের হাতে ফেরত দেবার নির্দেশ দিচ্ছেন। বিনয় হওয়া উত্তম চরিত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিনয় বা নম্রতা অর্থ কারো সাথে কেবল স্যার-স্যার কিংবা ভাই-ভাই করা নয়। এর অর্থ কোমল ব্যবহার। ধনী হোক কিংবা গরিব হোক সকলের সাথেই কোমল ব্যবহার করতে হবে। সূরা হিজরের ৮৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন “তুমি তোমার পার্শ¦দেশ মুমিনদের জন্য অবনত করে দাও।”
পিতামাতা আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। তাঁদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে ইসলামে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা নিসার ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন আল্লাহর ইবাদত করো, তার সাথে কিছু শরিক করো না এবং মাতা-পিতার সাথে উত্তম ব্যবহার করো। পিতামাতার নিকট মহান আল্লাহর দরবারে কিভাবে দোয়া করতে হবে সেটি সূরা ইসরার ২৪ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা আমাদের শিখিয়েছেন।
আল্লাহ বলেছেন বলো, হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করো যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন পালন করেছেন।
মহানবী সা. বলেছেন মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। তিনি আরো বলেছেন, পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। (বুখারী) আত্মীয়তার সাথে সুসম্পর্ক রাখার মানব চরিত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটি ওয়াজিবও বটে। তা ছিন্ন করলে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হতে হবে। আল্লাহ সূরা মুহাম্মাদের ২২-২৩ নং আয়াতে বলেছেন যদি তোমরা ক্ষমতা পাও, তাহলে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে? তারা তো ঐসব লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন। তিনি তাদেরকে বধির ও দ;ৃষ্টিশক্তি অন্ধ করে দিয়েছেন।
অঙ্গীকার পূর্ণ করা একটি উত্তম বৈশিষ্ট্য। সূরা ইসরার ৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন অঙ্গীকার পূর্ণ করো। কেননা এই সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাছাড়া ওয়াদা ভঙ্গ করা মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও উত্তম চরিত্রের অন্যতম কিছু বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো প্রতিবেশির সাথে ভালো ব্যবহার করা, গুরুজনকে সম্মান করা, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করা, বিপদের ধৈর্য ধারণ করে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা রাখা, লজ্জাশীলতা, ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, দান, জীবের প্রতি সদয়, চারিত্রিক মাধুর্য ইত্যাদি।
সাধারণত ভালো কাজের বিপরীতগুলো হলো আখলাকে যামিমা বা খারাপ ব্যবহার। চরিত্রের কতিপয় খারাপ দিক হলো দ্রুত রাগ করা, মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানো, গর্ব ও অহংকার করা, ব্যবহারে কঠোরতা ও রূঢ়তা প্রকাশ করা, মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, কারো গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেওয়া, মানুষের হঠাৎ ঘটে যাওয়া ভুল ক্ষমা না করা, হিংসা-বিদ্বেষ, কাজের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহার করা, প্রতিবেশির সাথে খারাপ ব্যবহার করা, উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা, কুরুচিশীল ও নোংরা ভাষা ব্যবহার করা, উপকার করে খোঁটা দেওয়া, অযথা ঝগড়া বাধানো, গোলমাল ও চেঁচামেচি করা, মানুষের সুন্দর নামে না ডেকে উপনামে ডাকা ইত্যাদি।
উত্তম চরিত্রের জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. আমাদের দোয়া শিখিয়েছেন। হে আমার প্রভু! আমাকে উত্তম পথে ধাবিত করুন। আপনি ছাড়া সেদিকে ধাবিত করার আর কেউ নেই। আর আমাকে অসৎ চরিত্র ও আচরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। আপনি ছাড়া তা থেকে দূরে সরানোর আর কেউ নেই। (বুখারী)
আমরা যেন আল্লাহ নির্দেশিত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত পথে জীবন অতিবাহিত করি এবং খারাপ পথ বর্জন করে নিজের সুন্দর জীবন এবং সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে পারি এই কামনা মহান আল্লাহর কাছে করি।

