বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ভাষা দূষণ রোধ করুন

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পাঠ: ৫৫ বার

হেই ব্রো, কেমন আছো? বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে এটি একটি অতীব পরিচিত বাক্য। শিক্ষিত মহলে এইরকম বিকৃত উচ্চারণ যেন এখন একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। লক্ষ্য করলেই দেখা যায় বাংলা উচ্চারণ কি ভয়াবহ রকমের ইংরেজির বিকৃতি উচ্চারণ দ্বারা প্রভাবিত! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভাষা বিকৃতিকরণের যেন এখন প্রতিযোগিতা চলছে। আর এটি করাটিও যেন এক প্রকার ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। পরিপূর্ণ শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন কতজন তা জরিপ করলে হয়ত ভয়াবহ আশঙ্কাজনক সংখ্যায় উঠে আসবে। বাংলার সাথে ইংরেজির মিশ্রণ যেন এখন ডাল-ভাতের মতো সহজ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ করছে একটা বড় কারণে, সেটা হলো উচ্চতর স্তরে বাংলা ভাষায় মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ এখন প্রায় নেই। বর্তমানে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম চলে ইংরেজি ভার্সনে এবং শিক্ষার্থীদের ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক পরীক্ষার খাতায় ইংরেজিতেই সব প্রশ্নের উত্তর লিখতে হয়। ভয়াবহ মাত্রায় ইংরেজি ভাষার চর্চার ফলে কখনও কখনও দেখা যায়, খাঁটি বাংলা ভাষায় কথা বলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যে ভাষার জন্য আমাদের দামাল ছেলেরা নিজের জীবন দিয়ে গেছেন, সেই ভাষা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করা আমাদের জাতিসত্তার জন্যই বড় লজ্জাজনক। ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর আমরা পালন করছি বটে, কিন্তু আমাদের দেশে বাংলা ভাষার শিক্ষার জন্য উচ্চতর স্তরের কত ভাগ পাঠ্যপুস্তক আমাদের হাতে তুলে দিতে পেরেছেন তা বড় প্রশ্নই থেকে যায়। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অযুহাতে আমরা ইংরেজিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বাংলাকে রীতিমতো অবজ্ঞা করছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন বদল হবে, সমাজে পরিবর্তন আসবে, কিন্তু অতিমাত্রায় বিদেশী ভাষা চর্চার ফলে নিজের মাতৃভাষা যেন অবজ্ঞার শিকার না হয় সেদিকে সকলের দৃষ্টি রাখতে হবে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এখন গণমাধ্যমে বিশেষ করে এফএম রেডিওতে বাংলা ভাষার যে ভয়ানকভাবে উচ্চারণ করা হয় এবং খুবই কু-রূচিশীলভাবে বাংলার বিকৃতি উচ্চারণ করা হচ্ছে। এফএম রেডিওর সঞ্চালকদের (আরজে বা কথাবন্ধু) মাধ্যমে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ ও বিকৃত উচ্চারণের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঁচমিশালী ভাষার যাত্রা শুরু হয়েছে। সকাল বেলা এফএম রেডিও চালু করলেই তাদের কন্ঠে ভেসে আসে, হ্যাল্লো লিসেনার… ঘড়ির কাঁটায় এখন সকাল ৭টা। আপনাদের সাথে আছি আমি ……। এখন গল্প করব আর ড্যাশিং-ডুশিং ফাটাফাটি গান শোনাব। এটি কেবল নির্দিষ্ট এফএম রেডিও নয়, বরং এটি দেশের অধিকাংশ এফএম রেডিওর চিত্র। একইভাবে আজকাল টেলিভিশনে প্রচুর নাটক ও ধারাবাহিক নাটক দেখানো হচ্ছে তাতে দূষণ ও বিকৃতিতে বাংলা ভাষা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করতে যাচ্ছেতাইভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে। চারদিকে যেন চলছে ভাষা বিকৃতির উৎসব। পথে ঘাটে সবর্ত্রই বিকৃতি বাংলা ভাষার কথোপকথন। আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেনা। এদের অনেকের কাছেই ইংরেজি ও বাংলা ভাষার মিশ্রণে তৈরি ভাষা প্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রিত ভাষাকে বাংলিশ বা বাংরেজি ভাষা বলে পরিচয় করিয়ে দিতেও অনেকে গর্ববোধ করে থাকেন। ভাষা দূষণ পরিবেশ দূষণের মতোই বিপজ্জনক। অথচ রক্ত দিয়ে অর্জিত এ ভাষার চরম বিকৃতি দেখার যেন কেউ নেই! ভাষার বিকৃতির নতুন উপদ্রব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম। অনেককেই দেখা যায় বাংলা ভাষার বিকৃতি করে কিংবা বাংলার সাথে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু মিশিয়ে ফেসবুকে নিজের অনুভূতি শেয়ার করেন। শিক্ষিত শ্রেনীর মধ্যেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তিদের এটি করতে দেখা যায়। ইংরেজি ও পাকিস্তান আমলে আমাদের ভাষার উপরে যে নির্যাতন চলেছে এখনও বাংলার উপর সেই আকারে নির্যাতন চলছে। তবে সেটি নীরব আকারে। হিন্দি ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে। অনেক সময় দেশের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও বিকৃত ও রূচিহীন ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। মহান জাতীয় সংসদের মতো জায়গায় ‘চুদুর বুদুর’ শব্দ ব্যবহার করে বক্তব্য দিতেও দেখতে হয়েছে। আবার কখনও মন্ত্রিপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও অপ্রকাশযোগ্য ভাষায় মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেখা গেছে। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমরা যদি আমাদের মাতৃভাষা রক্ষায় এখনই সজাগ না হই, তবে অচিরেই আমাদের মায়ের ভাষা বিলুপ্তির সাগরের গভীর তলদেশে নিমজ্জিত হবে। শুদ্ধ ভাষা চর্চার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এবং জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশের অফিস-আদালতে এবং সরকারি ওয়েবসাইটসমূহকে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভার্সন চালু করতে হবে। এবারের একুশের প্রতিজ্ঞা হোক-জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা চালু করে মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।

 

লেখক: প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।