কখনো আলো কখনো অন্ধকার
সারাদিনের চেষ্টা, প্রত্যাশা আর নিজের সঙ্গে লড়াই শেষে রাতে হাল ছেড়ে দিলেন। মনে হলো যেন আর কিছুই বোধহয় সম্ভব না জীবনে। প্রতিনিয়ত চেষ্টা আর নিজের পরিশ্রমের মূল্য যেন কোনোভাবেই ফিরে পাচ্ছেন না। যা চেয়েছিলেন, তা পাননি। যা ভেবেছিলেন, তা-ও হয়নি। দিনের সমস্ত হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজের কাছেই যেন নিজের অস্তিত্বের কারণ মেলাতে পারছেন না। এরপর সবকিছু ছেড়ে ঘুমাতে গেলেন। তবে একটা কাজ করলেন— পর্দা টেনে দিলেন না, জানালা খোলাই রাখলেন।
সকালে ঘরে আলো এসে পড়ল। আপনি জাগলেন, উঠে জানালার কাছে গেলেন। আলোকিত সকাল, গাছের পাতার নড়াচড়া, পাখির ডাক, আকাশে মেঘের আনাগোনা— পৃথিবীর পরিচিত নিয়মকে গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন। প্রকৃতি এত পরিবর্তনশীল, প্রবহমান! সে যেন সাফল্য আর ব্যর্থতার ধারই ধারে না। নেই কাউকে কিছু প্রমাণ করার তাড়া। কোথাও গতকালের ব্যর্থতার চিহ্ন নেই। রাতের অন্ধকার আর নেই। জগত থেমে নেই। নতুন দিনটি এমনভাবে শুরু হয়েছে যেন গতকাল কিছুই ঘটেনি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখলেন সব। গতকাল রাতে যা অসহনীয় ছিল তা আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি, ব্যর্থতাটা আছে, ভুলটাও আছে। স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার শূন্যতাটাও আছে। তবুও সকালের প্রকৃতি দেখে অনুভব হলো, গতকালের সেই ব্যর্থতাই তার জীবনের পুরো কাহিনী নয়। এত কিছুর মাঝেও নতুন দিন এসেছে। সৃষ্টিজগত আপন ছন্দে চলছে। আর আপনিও এই সৃষ্টিরই অংশ। আমরা দিনের শেষে প্রায়ই শুধু হিসাবের খাতা খুলি। কী পেলাম, কী হারালাম, কতটা এগোলাম, কতটা পিছিয়ে পড়লাম— অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করি। তারপর নিজের পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গোটা অস্তিত্বকেই ব্যর্থ বলে মনে হয়। আমরা কেন হতাশায় ডুবে যাওয়ার আগে প্রকৃতির দিকে তাকাই না? আমাদের অস্তিত্ব শুধু সফলতা-ব্যর্থতায় কেন মাপতে হবে? প্রকৃতির দিকে তাকালে মনে হয়, সবকিছুর সৌন্দর্য যেন কোনো ফলাফলের অপেক্ষায় বসে নেই। প্রকৃতির সবকিছু নিজেদের ছন্দে চলে। কেউ আরেকটির মতো হতে চায় না। তারা তাদের নিজস্বতা ও স্বকীয়তা বজায় রাখে। মানুষ কত সহজে নিজের প্রতি মমতা সরিয়ে নেয়! একটি ভুলের জন্য, একটি ব্যর্থতার জন্য, কারও অবহেলার জন্য নিজেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। যেন জীবনের প্রতিটি ঘটনা আমাদের ইচ্ছেমতো ঘটার কথা ছিল। সবকিছু তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কখনো সমস্ত চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছানো যায় না, আবার কখনো অপ্রত্যাশিত কোনো পথ খুলে যায়। কিন্তু যখন অপ্রত্যাশিত পথ পাই বা সাফল্য আসে তখন কি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি? কী পাইনি তা না দেখে, যা আছে বা যা পেয়েছি তাতে কি সন্তুষ্টি রাখা যায় না, যেরকম প্রকৃতি রাখে?
মানুষ মনে করে, কিছু অর্জন করতে পারলেই তার অস্তিত্ব সার্থক হবে, অন্যের স্বীকৃতি পেলেই সে মূল্যবান হয়ে উঠবে। অথচ তার নিজস্ব সত্তা, আমিত্ব ও অস্তিত্বেরও যে আলাদা মূল্য আছে, তা সে দেখতে পায় না। জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লে সে নিজের সমগ্র জীবন ও অস্তিত্বকে পিছিয়ে পড়া মনে করে। একটি ইচ্ছা পূরণ না হলে মনে করে, আর কিছুই সম্ভব নয়। অথচ আমরা কেউই জানি না সামনে কী অপেক্ষা করছে। বর্তমানের অপূর্ণতা দিয়ে ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনাকে বিচার করা যায় না।
কোনো একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায় পুরো জীবন কাটিয়ে দিলে যাত্রাপথে ছড়িয়ে থাকা জীবনকে অনুভব করা যায় না। আমরা যা অর্জন করি, তা আনন্দের হতে পারে; যা হারাই, তা কষ্টের হতে পারে। কোনোটিই আমাদের সমগ্র জীবনের চেয়ে বড় নয়। পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর জন্য ছুটতে ছুটতে আমরা যেন বর্তমানের জীবনটাকেই হারিয়ে না ফেলি। যে জীবনকে সুন্দর করার জন্য এত চেষ্টা, সেই জীবনকে অনুভব করার সময়ও তো আমাদের প্রয়োজন।
ফারসি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের নামে একটি প্রচলিত রুবাইয়াতের পঙক্তি মনে পড়ে—
যেহেতু কেউ আগামীকালের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না,
তাই এই আকুল মনটাকে এই মুহূর্তেই আনন্দিত করো।
জীবন অনিশ্চিত। তাই জীবনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত, যেখানে সবকিছু পাওয়ার শর্তে নয়; বরং তার অনিশ্চয়তা, অপূর্ণতা, আনন্দ আর দুঃখ—সবকিছুর মাঝখানে থেকেও জীবনকে ভালোবাসতে পারি, তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে না নিই আর যা আমাদের হাতে নেই তা নিয়ে প্রতিটি রাতের ঘুম হারিয়ে না ফেলি। দিন শেষে মানুষ সফলও হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। তার স্বপ্ন পূরণও হতে পারে, আবার কোনো স্বপ্ন অপূর্ণও থেকে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের মূল্য কি এসবের কোনোটির ওপর নির্ভর করে?
আগামীকাল কী হবে, আমরা জানি না। এই অনিশ্চয়তাকে পুরোপুরি দূর করার চেষ্টা করতে গিয়ে বর্তমানকে অস্থির করে তুলি। প্রকৃতি নিজের নিয়মে চলে। প্রকৃতির নিয়ম ও তার নিরন্তর পরিবর্তনই জগতকে সুন্দর করে। জীবনকে যদি তার স্বাভাবিক প্রবাহে চলতে দেওয়া যায়, তাহলে মনের অনেক অপ্রয়োজনীয় বোঝা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। এর অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং চেষ্টা করার পর ফলাফলকে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত রায় হিসেবে না দেখা। এই গ্রহণ করার মধ্যেই এক ধরনের আত্মিক মুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল। মনটা আবার ঘরের কোণে ফিরল। বের হওয়ার সময় হয়ে গেছে। আজও সারাদিন চেষ্টা করবেন। হয়তো সফল হবেন, হয়তো হবেন না৷ রাত আবার নামবে। দিনের আলোয় যে পৃথিবীকে এত সুন্দর মনে হয়েছিল, অন্ধকারে তার অনেক কিছুই আর দেখা যাবে না। তখন হয়তো পুরোনো কথাগুলো আবার ফিরে আসবে, অপূর্ণতার বোধ আরও গভীর হবে। আবারও ভাববেন আপনি পারবেন কি না। আগামীকাল কী হবে কেউ জানে না। তবুও জানালাটা খোলা রাখতে ভুলবেন না। কারণ রাত যত দীর্ঘই হোক, সকাল আসবেই— আর তার আলোয় হয়তো আপনি আবার শুরু করার সাহসটুকু খুঁজে পাবেন। যেমনটি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি তাঁর মসনবিতে লিখেছেন—
হতাশার পরেও অনেক আশা রয়েছে
অন্ধকারের পরেও অনেক সূর্য ওঠে
(মসনবি মানভি, ৩য় খন্ড, পঙক্তি- ২৯২৫)
জীবনের ছন্দ বোধ হয় এমনই—কখনো আলো, কখনো অন্ধকার। কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। তাই সাফল্য বা ব্যর্থতাকে জীবনের মাপকাঠি না ভেবে, বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করা ও মেনে নেওয়াই হয়তো জীবনের আসল পরিপূর্ণতা। সাফল্যকে অস্বীকার করা নয়, ব্যর্থতাকেও মহিমান্বিত করা নয়; বরং এই দুটির বাইরেও জীবনের যে মূল্য আছে, সেটিকে অনুভব করা। আমরা স্বপ্ন দেখব, চেষ্টা করব, ভুল করব, শিখব, কখনো থামব, বিশ্রাম নেব, নিজের মতো করে প্রকৃতি দেখব। প্রতিটি মুহূর্তে অসাধারণ কিছু করে দেখানোর প্রয়োজন নেই। জীবন নিজের মতো না হলেও সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে জানালাটা খোলা রাখা যায়— যাতে আলো এলে তাকে স্বাগত জানাতে পারি আর অন্ধকার নামলেও যেন ভুলে না যাই যে আমাদের অস্তিত্বের মূল্য কোনো একটি দিনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চেয়ে অনেক বড়।
জান্নাতুন নার্গিস চৈতী
শিক্ষার্থী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
