বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

টিকিট প্রতি ২০ টাকা: ট্রেনের অনলাইন টিকিট যেন ডিজিটাল বোঝা

Author

হাবিব আল মিসবাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৫ পাঠ: ৩৩ বার

বাংলাদেশ রেল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সুলভ গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন লাখো মানুষ রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যাতায়াতের জন্য এই সেবার ওপর নির্ভর করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানা প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা অনেক সময় এই ট্রেন সেবা। জনচাহিদা এবং সময়ের দাবি মেনে রেল সেবায় প্রযুক্তির সংযোজনের দাবি উঠেছিল বহুবার।পরবর্তীতে যখন তা কার্যকর হয় সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

 

রেলের টিকিট সেবা সহজলভ্য করতে ২০২০ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে ‘সিএনএস’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে অনলাইন টিকিটিং সেবা চালু করে। তাদের নিজস্ব তৈরি অ্যাপের মাধ্যমে ই-টিকিট বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যাত্রীসেবার উন্নয়নে দৈনিক টিকিটের ৫০ শতাংশ অনলাইনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই নাগরিক সুবিধাটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে সিএনএস মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘরে বসেই টিকিট কাটার সুবিধা মিললেও অল্প সময়েই নানা অভিযোগ উঠতে থাকে সিএনএস অতিরিক্ত চার্জ নিচ্ছে, সেবায় স্বচ্ছতা নেই এবং দুর্নীতি হচ্ছে। সার্ভিস চার্জের নামে সংস্থাটি প্রতিমাসে হাতিয়ে নিয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। প্রতিটি অনলাইন টিকিট থেকে ২০ টাকা চলে যেতো সংস্থাটির কাছে। একপর্যায়ে দুর্নীতির দায়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ হারায়।

পরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন নতুন করে ‘সহজ.কম’ নামের আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেন। ঘোষণায় বলা হয়, সহজ প্রতি টিকিটে মাত্র ২৫ পয়সা সার্ভিস চার্জ নেবে। তবে কীভাবে চার্জ আদায় হবে, তা যাত্রীদের কাছে পরিষ্কার করে জানানো হয়নি।

 

আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনলাইনে একটি টিকিট কাটলে যাত্রীকে ২০ টাকা অতিরিক্ত চার্জ দিতে হচ্ছে। একসঙ্গে একাধিক টিকিট কাটলে এই পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, কেউ একসঙ্গে চারটি টিকিট কাটলে গুনতে হচ্ছে ৮০ টাকা, যা একেবারেই অযৌক্তিক এবং জনসাধারণের উপরে চাপিয়ে দেওয়া এক বোঝা।

 

এই পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন উঠে, সরকারি সেবায় বারবার কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হবে?

বর্তমানে যেখানে সরকার নিজেই তথ্যপ্রযুক্তি, সার্ভার, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রাখে, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রীদের কাঁধে বাড়তি বোঝা চাপানো কি একপ্রকার দায় এড়ানো নয়? সরকার যদি ইচ্ছে করে, চাইলেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই অনলাইন টিকিটিং সেবা পরিচালনা করতে পারে। সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হলে অনিয়ন্ত্রিত চার্জ আদায়ের সুযোগ যেমন থাকবে না, তেমনি নাগরিকের ওপরও কোনো বাড়তি বোঝা চাপবে না।

দেশে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সেবাখাতে ডিজিটাল সিস্টেম সফলভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা তথ্য ব্যবস্থাপনা, এমনকি ভ্যাট-ট্যাক্সের ক্ষেত্রেও। সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা খাতে বারবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।

 

উন্নত বিশ্বে সরকারি পরিষেবার ডিজিটাল রূপান্তরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত।

উদাহরণস্বরূপ, জাপান, জার্মানি বা সুইডেনের মতো দেশে ট্রেনের টিকিট কাটা সম্পূর্ণভাবে সরকার পরিচালিত প্ল্যাটফর্মে হয় কোনো আলাদা সার্ভিস চার্জ ছাড়াই। তারা মনে করে, পরিবহণ একটি নাগরিক অধিকার, ব্যবসার সুযোগ নয়। এমনকি ভারতের আইআরসিটিসি (Indian Railway Catering and Tourism Corporation) নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট সেবা দিয়ে থাকে, যেখানে চার্জ অনেক ন্যূনতম ও স্বচ্ছভাবে নির্ধারিত।

 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে যখন একটি সেবাকে বাণিজ্যে পরিণত করা হয়, তখন তা আর নাগরিক সেবা থাকে না বরং হয় ভোগান্তির উৎস, জনগণের উপর শোষণ। অতিরিক্ত চার্জ, সীমিত জবাবদিহিতা এবং অপর্যাপ্ত স্বচ্ছতা জনবিশ্বাসে চিড় ধরায়।

 

তাই সময় এসেছে রেল অনলাইন টিকিটিং সেবাকে সরকারি তত্ত্বাবধানে এনে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুলভ ব্যবস্থায় রূপান্তর করার। নাগরিকের ঘাড়ে ডিজিটাল খরচের বোঝা চাপিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। ডিজিটাল সেবা তখনই সফল, যখন তা সহজ, স্বচ্ছ ও মানুষের জন্য বোঝাহীন হয়।

 

অনলাইন টিকিট সেবাকে সত্যিকারের সেবা রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই অতিরিক্ত চার্জ বাতিল করা, সেবাকে সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা, এবং যাত্রীবান্ধব ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এখনই গড়ে তুলতে হবে।

 

 

হাবিব আল মিসবাহ

শিক্ষার্থী: আল-কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মোবাইল: 01611563819

 

মেইল: hmh42242@gmail.com

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২১ জুন ২০২৫ তারিখে আজকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।