ঢাকার যানজটের নেপথ্যে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন
ঢাকার জ্যামে বসে কখনো ভেবেছেন ঠিক কোন কারনে জ্যামটা লেগেছে? বা এলোপাতাড়ি লোকাল বাসে বসা অবস্থায় পেছনে থাকা গাড়িগুলোর অবস্থা চিন্তা করেছেন? এ দুটি প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ঢাকা শহরের জ্যামের অন্যতম মূল কারণ। ফিটনেসবিহীন ও অনুপযোগী লোকাল বাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল আজ ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ। এছাড়াও, লাগামহীন লেগুনা ও অনিয়ন্ত্রিত রিকশা ঢাকার রাস্তাকে স্থবির করে রাখছে। ট্রাফিক ব্যবস্থার নাজেহাল দশায় রাজধানীতে চলাচল করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে যেখানে দরকার মাত্র ৫-১০ মিনিট, সেখানে যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় বসে থাকেন। জনগণের মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে এ সকল অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে।
ঢাকায় বসবাসকারী প্রায় ২ কোটি মানুষের অধিকাংশই দৈনন্দিন চলাচলে ব্যবহার করেন রিকশা, লেগুনা ও লোকাল বাস। প্রাথমিক অবস্থায় এ যানবাহনগুলো ছিলো সীমিত সংখ্যায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই প্রতিবছর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এ সংখ্যা। প্রতিবছর এগুলোর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে বাড়তে আজ তা চাহিদার অধিক। ফলাফলস্বরূপ, লেগুনা ও রিকশাগুলো ঢাকার অলিগলিতেই চলছে না শুধু, ব্যস্ততম মহাসড়কগুলোতেও এদের অবাধ চলাচল। যখন মহাসড়কগুলোতে দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে ধীরগতির রিকশা বা লেগুনা চলাচল করে, তখনই গতির তারতম্যের কারণে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
যানজটের অন্যতম কারণ চালকদের সচেতনতার অভাব ও সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা। যানবাহনগুলোর প্রায় সকল চালক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অশিক্ষিত হওয়ায় রাস্তার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ। নির্দিষ্ট লেন অনুসরণ, গতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা ট্রাফিক পুলিশের আদেশ কোনটাই মান্য করতে দেখা যায় না চালকদের। লেগুনা ও বাস চালকদের জরিমানা করা গেলেও রিকশার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন থেকে তাদের লাইসেন্স নেওয়ার নিয়ম না থাকায় লাইসেন্স বাতিলকরণ বা জরিমানা করারও উপায় নেই। এই আইনি শিথিলতার সুযোগ নিয়ে তারা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে রিকশা চালায়।
লোকালবাসগুলোর যত্রতত্র যাত্রী ওঠা-নামা করানো ঢাকার রাস্তার পরিচিত চিত্র। রাস্তাগুলোতে নির্দিষ্ট বাসস্টপ থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করেন না চালকরা। রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করানো তাদের অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেছনের বাসগুলো যেনো আগে যেতে না পারে কিংবা পরের সিরিয়ালের বাস যেন ওভারটেক না করতে পারে সেজন্য বাসগুলো এলোপাতাড়ি ও জিগজ্যাগ আকারে রাস্তায় থামিয়ে রাখেন। লোকাল বাসগুলোর কোন্দলের কারণে বেগ পোহাতে হয় সাধারণ জনগনের। পেছনে থাকা প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্য যানবাহনের যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অসহায়ভাবে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। লোকাল বাসগুলোর এ অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ ব্যতীত এর প্রতিকার সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এক আতঙ্কের নাম ব্যাটারিচালিত রিকশা। এ ধরনের রিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণ। নির্দিষ্ট লেন থাকা সত্ত্বেও এদের চলাচল করতে দেখা যায় ভারি যানবাহনের সাথে একই লেনে। প্রাইভেট কারের সাথে সংঘর্ষ, অনিয়ন্ত্রিত লেন পরিবর্তন ও অসতর্ক মোড় নেওয়া- এ সকল প্রতিদিনকার দৃশ্য। মহাসড়কে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও সফলতার মুখ দেখেনি সরকার। বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাতায়াত এক মরণফাঁদের নাম। প্রাইভেটকার ও বাসের সাথে প্রতিযোগিতা করে চলাচল করতে দেখা যায় এদের। অধিকাংশ রিকশা চালকের মালিকানাধীন না হওয়ায় দায়িত্ববোধের অবহেলা দেখা যায়। যার কারণে বেপরোয়া চালাতে দ্বিধাবোধ করেন না তারা। আর লাইসেন্সের বিধিনিষেধ না থাকায় জরিমানা গণনার ভয় তাদের থাকে না।
একটি দেশের সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা সেদেশের উন্নতি ও অগ্রগতিকে নির্দেশ করে। নির্বিঘ্ন ট্রাফিক ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরো গতিময় করতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় জ্যামে অবস্থানের ফলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়না, মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেও এর প্রভাব পড়ে। যানজট সমস্যার প্রতিকারে দরকার সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ। ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ, নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গে কঠোর জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের দমন এবং সড়কগুলোতে সক্রিয় ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের মতো কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। সড়কগুলোতে ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
চালকদের নৈতিক উন্নয়নে সচেতনতা বৃদ্ধিও গুরুত্বের দাবিদার। একইসাথে জনগণের সচেতনতা ও অপরাধ দমনে স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা পালন করাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও জনগণ একীভূত হয়ে কাজ করলে রাজধানী সহ দেশের সকল সড়ক ও মহাসড়কের যানজট অতি সহজেই নিরসন হবে। ফলাফলস্বরূপ, ঢাকার সড়কগুলো হবে সচল ও নির্বিঘ্নে চলাচলযোগ্য।
