শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সংসারে একজন বাবার আত্নত্যাগ

Author

মিথিলা আক্তার , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

সংসার কোনো অট্টালিকা নয় যে ইট-পাথর গাঁথলেই দাঁড়িয়ে যায়। সংসার হলো এক অবিরাম স্রোতের নদী। তাতে বান ডাকে, ভাঙন লাগে, চর জাগে। আর সেই নদীর বুকে যে মানুষটি একলা বৈঠা বেয়ে পরিবার নামক তরীটিকে স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে নেন, তিনি আর কেউ নন—আমার বাবা, আপনার বাবা, এই পৃথিবীর প্রতিটি নীরব নায়ক। তিনি সংসারের হাল। তিনি নিঃশব্দের মহাকাব্য। তিনি আত্মত্যাগের প্রতিমা। ভোরের আজানের আগেই যার ঘুম ভাঙে, তিনি বাবা। মাসের শেষ তারিখে মানিব্যাগের প্রতিটি নোট গুনে যে মানুষটি নিজের শপিংয়ের,ওষুধের টাকাটা বাদ দেন-তিনি বাবা। আমরা দেখি—ফ্রিজে মাছ, পড়ার টেবিলে নতুন বই, ঈদে নতুন জামা।কিন্তু দেখি না, এই ‘আছে’র পেছনে একজন মানুষের পরিশ্রম কত বিশাল। নিজের পায়ের ছেঁড়া স্যান্ডেলটা জোড়া তালি দিয়ে আরেকটা বছর চালিয়ে নেন, যেন মেয়ের কলেজের বেতনটা সময়মতো দেওয়া যায়। বন্ধুরা যখন কক্সবাজার ঘোরার প্ল্যান করে, তিনি চুপচাপ হিসাব কষেন—ছেলের ল্যাপটপটা না কিনলে তো তার অনলাইন ক্লাসটা হবে না। বাবার ডায়েরিতে নিজের জন্য কোনো পাতা বরাদ্দ নেই। সব পাতা জুড়ে শুধু সন্তানের নাম, সন্তানের তারিখ, সন্তানের প্রয়োজন।মায়ের ত্যাগ চোখে দেখা যায়—রান্নাঘরের আগুনে পোড়া হাত, সন্তানের জ্বরে ভেজা আঁচল। তাই মা-কে নিয়ে সাহিত্য হয়, সিনেমা হয়। কিন্তু বাবার ত্যাগ? তা নীরবতার চাদরে মোড়া। কে জানে,অফিসে বসের অন্যায় ধমক হজম করে তিনি ওয়াশরুমে গিয়ে দু-সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিলেন? কে জানে, বাজারে গিয়ে ইলিশের দাম শুনে চুপচাপ রুই মাছটা কিনে এনেছিলেন, যেন পকেটের টাকাটা বেঁচে যায়। কে জানে, মেলায় গিয়ে অন্য বাচ্চাদের হাতে খেলনা দেখে নিজের মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দোকানদারকে ফিসফিস করে বলেছিলেন—ভাই, একটু কম রাখা যায়? তার কান্না নেই, অভিযোগ নেই। তার ভালোবাসার বর্ণমালা মাত্র তিনটি শব্দে—লাগবে কিছু, মা? তার রাগের বহিঃপ্রকাশ—রাতের ভাতটা একটু জোরে মাখিয়ে নেওয়ার মধ্যে। তার স্বপ্নের উচ্চারণ—তোরা মানুষ হ, বাবা। সংসারে দুঃসময় আসবেই। চাকরি চলে যাবে, ব্যবসায় লোকসান হবে, বাবা-মা অসুস্থ হবেন। মা কাঁদলে সন্তানের বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু বাবা? তিনি কাঁদতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন, এই নৌকার মাঝি যদি হাল ছেড়ে দেয়, তবে সবাই অতলে তলিয়ে যাবে। যখন বলি বাবা টাকা লাগবে এরপর নিজেও চিন্তায় পরে যাই তখন বাবা চিন্তিত হওয়ার পরিবর্তে উল্টো সাহস দেন। বলেন, এতো টেনসন করিস না উপরে একজন তো আছেনই। রাত বারোটার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সংসারের চিন্তা করেন, চিন্তা করতে করতে চোখের কোণে জল জমে, কিন্তু তা গড়িয়ে পড়ে না। কারণ তিনি জানেন জল গড়িয়ে পরলে তার সংসারটাও গড়িয়ে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। তাই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরেন আবার সকাল হলেই মুখে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। ঋণের নোটিশ হাতে নিয়েও সন্তানকে বলেন-টেনশন করিস না,বাবা।টাকা আসবে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই ঠিক হয়ে যাবে’র ভেতরেই লুকিয়ে থাকে তার হাজারো নির্ঘুম রাত। যতদিন সন্তান, ততদিন বাবা মানে এটিএম কার্ড। যতদিন ছাত্র, ততদিন বাবা মানে টাকার মেশিন। বাবাকে আমরা চিনি যখন নিজেরা বাবা হই। যেদিন প্রথমবার সন্তানের জ্বরে নিজের বুক কেঁপে ওঠে। যেদিন মাসের ২০ তারিখেই বেতনের টাকা ফুরিয়ে যায় তখন পুরোনো অ্যালবাম খুলি। দেখি, বিশ বছরের সেই যুবক বাবাটার চোখে কত রঙিন স্বপ্ন ছিল। হিমালয় দেখার,সমুদ্র দেখার শখ ছিল, গিটার বাজানোর শখ ছিল। আজ সেই চোখে শুধু আমার মুখ। তিনি নিজের সব শখ, সব অসুস্থতা, সব ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে আমাকে একটা ভিত দিয়ে গেছেন। আমি আজ যে স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নের সিঁড়িটা তিনি নিজের বুক পেতে বানিয়ে দিয়েছেন। মায়ের ঋণ যেমন নয় মাস দশ দিন দিয়ে শোধ হয় না, বাবার ঋণও তেমন চল্লিশ বছরের পরিশ্রম দিয়েও শোধ হয় না। তবু চেষ্টা করা যায়। চেষ্টা করা যায়—অফিস থেকে ফিরে তার পাশে বসে এক কাপ চা খাওয়ার। চেষ্টা করা যায়—তার ছেঁড়া পাঞ্জাবিটা না দেখে তার কাঁচাপাকা চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দেওয়ার। চেষ্টা করা যায়—ঈদে তার জন্য একটা নতুন লুঙ্গি কেনার, যদিও তিনি বলবেন, টাকা নষ্ট করিস না, তোর জন্য কিছু কিন। বাবারা উপহার চান না। তারা চান সন্তানের সাথে দু চার মিনিট সঙ্গ দেওয়ার। চান, সন্তান একবার তার গল্পটা শুনুক—কীভাবে তিনি শূন্য থেকে সংসারটা গড়েছিলেন। চান, শেষ বয়সে এসে সন্তানের কাঁধে মাথা রেখে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে। আজ বাংলাদেশ বদলেছে। বদলায়নি শুধু বাবার বেতনের টাকাটা। আজ পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রো চলছে, আমরা স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু এই উন্নয়নের ভিতটা গড়েছেন কারা? গড়েছেন আমার বাবার মতো কোটি কোটি নীরব শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী বাবারা। তারা নিজেরা অন্ধকারে থেকে আমাদের জন্য আলোর রাস্তা বানিয়ে যাচ্ছেন। তাই আমরা দেরি হওয়ার আগেই বাবাকে ভালোবাসি। তাকে জড়িয়ে ধরে বলি—বাবা, তুমি আমার পৃথিবী। তুমি না থাকলে আমার জীবনের অস্তিত্বই থাকতো না। কারণ বাবা নামক হালটা একদিন সত্যিই দুর্বল হয়ে যাবে। বৈঠা হাত থেকে পড়ে যাবে। নদীতে তখন আর জোয়ার থাকবে না। তার আগেই যদি আমরা বাবার নীরব আত্মত্যাগের মূল্য দিতে শিখি, তবে হয়তো তিনি শেষ বয়সে এসে একটু শান্তি পাবেন। আর একজন বাবার শান্তির চেয়ে সন্তানের জন্য বড় প্রাপ্তি আর কিছুই নেই। আর একটি বাবার হাসির চেয়ে পবিত্র দৃশ্য আর দ্বিতীয়টি নেই।

 

লেখক পরিচিতিঃ-
নামঃ মিথিলা জসিম তন্নি।
বিভাগঃ বাংলা।
শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।
মোবাইলঃ 01614510294
ইমেইলঃ mithilajasim@gmail.com

লেখক: উপ- প্রচার সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ২১ জুন ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।